রামাদান : আল্লাহ এর বিশেষ অনুগ্রহ ও পুরস্কার
রামাদান : আল্লাহ এর বিশেষ অনুগ্রহ ও পুরস্কার
আহা! পবিত্র মাহে রামাদানের বরকতময় দিনগুলাে কত যে দ্রুত ফুরিয়ে যায়! যেন কয়েকটি মুহূর্তমাত্র। রামাদান শেষে দীর্ঘ একটি মাসকে মনে হয় যেন কয়েকটি দিনমাত্র। অতঃপর আবার আমরা আরেকটি মাহে রামাদানের অপেক্ষায় থাকি।
এ মাস পুণ্যকর্ম সম্পাদনের মাস; পুণ্যার্জনের মাস; পাপ-পঙ্কিলতা থেকে বেঁচে থাকার মাস; পাপ-পঙ্কিলতা থেকে পবিত্র হওয়ার মাস; আত্মিক উন্নতি সাধনের মাস।এই মাসে উল্লেখযােগ্য হারে সৎ কাজের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং বিনিময় স্বরূপ উল্লেখযােগ্য প্রতিদান-পুরস্কারেরও ওয়াদা করা হয়েছে। বহু হৃদয়, বহু আত্মা এ মাস পাওয়ার জন্য, এ মাসে উপনীত হওয়ার জন্য অধীর আগ্রহে ব্যাকুল হয়ে থাকে। তিরমিযী ও অন্যান্য হাদীসগ্রন্থে বর্ণিত, নবীজী * ইরশাদ করেছেন
রামাদানের প্রথম রাতেই শয়তানদের শিকল পরিয়ে দেওয়া হয়। দুষ্ট প্রকৃতির জিন সম্প্রদায়কে আটক করে রাখা হয়। জাহান্নামের দরজাসমূহ এমনভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়, যা আর খােলে না। জান্নাতের দরজাসমূহ এমনভাবে খুলে দেওয়া হয়, যা আর বন্ধ হয় না। একজন ঘােষক ঘােষণা করতে থাকে- “হে কল্যাণাকাঙ্ক্ষী! এসাে! এখানে এসাে! হে অশুভকামী থামাে! ক্ষান্ত হও! কিছুসংখ্যক লােককে আল্লাহ জাহান্নাম থেকে মুক্তির ঘােষণা দেন। আর প্রতিরাতে এভাবেই কার্যক্রম চলতে থাকে। [সুনানে তিরমিযী, ৬৮২]
মুআল্লা বিন ফজল (রহ.) বলেন-
এক বুযুর্গ ব্যক্তির একটি দাসী ছিল। বুযুর্গ দাসীটিকে অন্য এক ব্যক্তির নিকট বিক্রি করে দিলেন। মাহে রামাদান নিকটবর্তী হলে দাসীর নতুন। মনিব রামাদানের প্রস্তুতিমূলক বিভিন্ন খাবার তৈরির আয়ােজন করতে লাগল। দাসী সবিস্ময়ে মনিবকে প্রশ্ন করল, আপনি এসব কী করছেন?মনিব উত্তর দিল, রামাদানের প্রস্তুতি নিচ্ছি।দাসী বলল, আপনি কি একাই সিয়াম পালন করবেন? আল্লাহর কসম! আমি তাে এমন ব্যক্তির কাছ থেকে এসেছি, যার পুরাে বছরই ছিল রামাদান সদৃশ। আপনার এতসব কিছু আমার নিষ্প্রয়ােজন। আমাকে আমার পূর্বের মনিবের কাছে ফিরিয়ে দিন। দাসী তার পূর্বের মনিবের কাছে ফিরে যায়।
যে সকল মুসলিম ভাই-বােন রামাদানের সিয়াম রাখেন, সিয়াম পালন করেন, তাদের উদ্দেশে বলছি। প্রিয় ভাই ও বােনেরা! আলহামদুল্লিাহ! এ সময়ে আমরা ইবাদাতের বসন্ত-মাস, মাহাত্মের মাস, রামাদানে উপনীত। তাই আজকের এ দিনটি নিঃসন্দেহে গতকালের মতাে সাধারণ কোনাে দিন নয়।
আহা! পবিত্র মাহে রামাদানের বরকতময় দিনগুলাে কত যে দ্রুত ফুরিয়ে যায়! যেন কয়েকটি মুহূর্তমাত্র। রামাদান শেষে দীর্ঘ একটি মাসকে মনে হয় যেন কয়েকটি দিনমাত্র। অতঃপর আবার আমরা আরেকটি মাহে রামাদানের অপেক্ষায় থাকি।
গত রামাদানে আমাদের কত পরিচিত মুখ, কত বন্ধু-বান্ধব ও হিতাকাঙ্ক্ষী আমাদের সাথে ছিলেন। কিন্তু আজ তারা আমাদের মাঝে নেই। অন্ধকার কবরে নিঃসঙ্গ জীবন যাপন করছেন। হতে পারে এই রামাদান আমাদেরও কারও কারও জীবনের শেষ রামাদান হয়ে যাবে। আল্লাহর শােকর! আমরা সত্যিই আরেকটি মাহে রামাদানে উপনীত হয়েছি।।
রামাদান মুমিনের জন্য মহান আল্লাহ আমার পক্ষ থেকে এক বিশেষ অনুগ্রহ ও নেয়ামত। মুমিনের জন্য আনন্দময় সংবাদ ও রহমত। তাই আমাদের কর্তব্য- এই মহৎ মাসের যথাযথ সদ্ব্যবহার করা; বিপুল পুণ্যার্জনে সর্বাত্মক চেষ্টা করা এবং মহান আল্লাহ তায়ালার দরবারে অনবরত করাঘাত করে যাওয়া।পবিত্র কুরআনে আল্লাহ ৩৪ ইরশাদ করেছেন-
شهر رمضان الذى أنزل فيه
القرآن هدى للناس وبينات من الهدى والفرقان
রামাদান মাসই হল সে মাস, যাতে নাযিল করা হয়েছে কুরআন, যা মানুষের জন্য হেদায়েত এবং সত্যপথ যাত্রীদের জন্য সুস্পষ্ট পথ নির্দেশ আর ন্যায় ও অন্যায়ের মাঝে পার্থক্য বিধানকারী। [সূরা বাকারা : ১৮৫]। সুনানে নাসাঈ ও বাইহাকীতে বর্ণিত এক হাদীসে রাসুলুল্লাহ ও ইরশাদ করেছেন-
قد جاءكم شهر رمضان شهر مبارك افترض الله عليكم
صيامه يفتح فيه أبواب الجنة ويغلق فيه
أبواب الجحيم وتغل فيه الشياطين فيه ليلة خير من ألف شهر من حرم خيرها فقد حرم
রামাদান মাস তােমাদের নিকট উপস্থিত। বরকতময় মাস। এ মাসে আল্লাহ তােমাদের উপর সওমকে ফরয করেছেন। জান্নাতের সকল দরজা উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। জাহান্নামের সকল দরজা তালাবদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে। মজবুত শিকলে শয়তানদের বেঁধে রাখা হয়েছে। এ মাসে এমন এক মহান রাত রয়েছে, যা সহস্র মাস অপেক্ষা উত্তম। যে ব্যক্তি এ মাসের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত থাকবে, সে যেন সমস্ত কল্যাণ থেকেই বঞ্চিত থাকল। হাদীস . নং ৮৯৯১]
সহীহ বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ও ইরশাদ করেছেন
إذا دخل رمضان فتحت أبواب الجنة وغلقت أبواب جهنم
وسلسلت الشياطين فتحت أبواب الجنة .
রামাদান মাসের সূচনালগ্নেই জাহান্নামের সমস্ত দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়, শয়তানদের শৃঙ্খলিত করা হয় এবং জান্নাতের দরজাসমূহ উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। [হাদীস নং ৩২৭৭]এ মাস পুণ্যকর্ম সম্পাদনের মাস; পুণ্যার্জনের মাস; পাপ-পঙ্কিলতা থেকে বেঁচে থাকার মাস; পাপ-পঙ্কিলতা থেকে পবিত্র হওয়ার মাস; আত্মিক উন্নতি সাধনের মাস।এই মাসে উল্লেখযােগ্য হারে সৎ কাজের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং বিনিময় স্বরূপ উল্লেখযােগ্য প্রতিদান-পুরস্কারেরও ওয়াদা করা হয়েছে। বহু হৃদয়, বহু আত্মা এ মাস পাওয়ার জন্য, এ মাসে উপনীত হওয়ার জন্য অধীর আগ্রহে ব্যাকুল হয়ে থাকে। তিরমিযী ও অন্যান্য হাদীসগ্রন্থে বর্ণিত, নবীজী * ইরশাদ করেছেন
ان كان اول
ليلة من رمضان صفدت الشياطين ومردة الجن ، وغلقت أبواب النار فلم يفتح منها
باب ، وفتحت أبواب الجنان فلم يغلق منها باب ونادی مناد : يا باغي الخير أقبل ،
ويا باغي الشر أقصر، ولله عتقاء من النار
মাহে রামাদান কল্যাণের মাস, রহমত-বরকতের মাস। বিজয় মহাবিজয়ের মাস। ইতিহাস সাক্ষী- বদর-বিজয়, হিত্তীন-বিজয় আন্দালুস-বিজয় সহ ইসলামের আরও উল্লেখযােগ্য কিছু বিজয় সংঘটিত হয়েছিল এ রামাদান মাসেই। প্রকৃত ধার্মিক ও নিষ্ঠাবান। ব্যক্তিরা আল্লাহ তার অনুগ্রহধন্য ও অনুগ্রহের পাত্র হওয়ার জন্য এ রামাদান মাসকে খুব বেশি কাজে লাগাতেন; এ রামাদানকে নিয়ে খুব বেশি ও গভীর চিন্তা-ফিকির করতেন।
আমাদের পূর্বসূরিগণ নিরাপদে রামাদানে উপনীত হওয়ার আশায়। ছয় মাস আগে থেকেই আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করতেন। ইয়াহইয়া ইবনে আবী কাসীর (রহ.) বলেন- পর্বসরিগণ তাদের প্রার্থনায় এই নিবেদন করতেন- হে আল্লাহ! রামাদান অবধি আমাদের সুস্থ ও নিরাপদ রাখুন। রামাদানের জন্যও নিরাপদ রাখুন। আমাদের এ মাস কবুল করে নিন। প্রকতপক্ষে তারা রাতদিন দান-অনুদান, নফল সালাত-সওম ইত্যাদি পালনের মাধ্যমে বেশ পূর্ব থেকেই রামাদানের প্রস্তুতি নিতেন। দাঁড়িয়ে বসে সেজদায় লুটিয়ে বিনয়াবনত অবস্থায় আবেগ আপ্লুত কণ্ঠে স্রষ্টার নিকট অনবরত নিবেদন করতেন। তারাই সেই সমস্ত লােক, যাদের ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে ঘােষণা করা হয়েছে
فلا تعلم نفس ما أخفي لهم من قرةاعين جزاء بما
كاوا يعملون ا فمن کان مؤمناكمن كان فاسقا
لا يستون
কেউ জানে না, তাদের জন্য নয়নপ্রীতিকর কী লুকায়িত রাখা হয়েছে তাদের কৃতকর্মের পুরস্কারস্বরূপ। তবে যে ব্যক্তি মুমিন, সে কী পাপাচারী ব্যক্তির মতাে? তারা সমান নয়।| [সূরা সেজদা : ১৭-১৮]
আসলে তাঁরা ছিলেন রামাদানের ফরযিয়ত, আবশ্যকীয়তা ও মাহাত্ম্য গভীরভাবে অনুধাবন ও হৃদয়ঙ্গম করতে পরিপূর্ণরূপে সক্ষম। রামাদান শুধু খাদ্য ও পানীয় থেকে বেঁচে থাকার নাম নয়; বরং রামাদান মানব সম্প্রদায়কে এই শিক্ষা দেয় যে, তার একজন স্রষ্টা আছেন। এ হুকুম তাঁরই পক্ষ থেকে। তিনিই সিয়াম সাধন ও ইফতারের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বান্দার জন্য যখন যা পছন্দ ও ভালাে মনে করেন, তখন তা-ই নির্দেশ করেন।
অতএব, আমাদেরও উচিত তাঁর যথাযথ ইবাদত করা, তাঁর মাহাত্ম্য অনুধাবন করা এবং সর্বাবস্থায়ই তাকে ভয় করা। পবিত্র কুরআনে ঘােষণা করা হয়েছে-
يأيها الذين امنوا
كتب عليكم الصيام گما كتب على الذين من قبلكم لعلكم تتقون '
হে ঈমানদারগণ! তােমাদের উপর সওম ফরয করা হয়েছে, যেরূপ ফরয করা হয়েছিল তােমাদের পূর্ববর্তী লােকদের উপর, যেন তােমরা মুত্তাকী [খােদাভীরু হতে পার। (সূরা বাকারা : ১৮৩]


No comments
মন্তব্যের জন্য আল বেলায়েত মিডিয়া এর পক্ষ থেকে আপনাকে ধন্যবাদ।