শবে বরাতের ফজিলত।
শবে বরাতের ফজিলত।
শবে বরাতের পক্ষে বিপক্ষে আলোচনা সমালোচনার অন্ত নেই। বিভ্রান্তও হচ্ছেন অনেক মুসলিম। এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেছেন পাকিস্তানের সাবেক বিচারপতি, বিজ্ঞ আলেম আল্লামা মুফতি তাকি উসমানি।
শবে বরাতের ফজিলত ভিত্তিহীন নয়!
শবে বরাতের আমল হাদিস দ্বারা প্রমানীত নয় এমনটি বলা সম্পূর্ণ ভূল। শবে বরাতের ফাজায়েল বর্ণিত বিভিন্ন হাদিস অন্তত দশজন সাহাবা সাহাবায়ে কেরাম রাযি. রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেছেন। তন্মধ্য থেকে দু-একটি হাদীস সনদের বিবেচনায় অবশ্যই দুর্বল । যার কারণে কিছু উলামায়ে কেরাম এ রাতের ফযীলতকে ভিত্তিহীন বলেছেন।
কিন্তু মুহাদ্দিস ও ফকীহগণ হাদীসশাস্ত্রের মূলনীতি সম্পর্কে বলেছেন: সনদের বিবেচনায় কোনো হাদীস যদি কমজোর হয়, যার সমর্থনে আরো হাদীস পাওয়া যায়, তাহলে সেই হাদীস আর দুর্বল থাকে না। আর দশজন সাহাবা শবে বরাতের ফযীলত সম্পর্কে হাদীস বর্ণনা করেছেন। সুতরাং যার সমর্থনে দশজন সাহাবার হাদীস রয়েছে, সেই বিষয়টি আর ভিত্তিহীন থাকে না। তাকে ভিত্তিহীন বলা ভুল হবে।
শবেবরাত এবং খায়রুল কুরুন
তিনটি যুগ মুসলিম উম্মাহর নিকট শ্রেষ্ঠ যুগ। সাহাবায়ে কেরামের যুগ, তাবেঈর যুগ, তাবে-তাবেঈর যুগ। এ তিন যুগেও দেখা গেছে, শবে বরাত ফযীলতময় রাত হিসাবে পালন করা হতো। মানুষ এ রাতে ইবাদতের জন্য বিশেষ গুরুত্ব দিতো। সুতরাং একে বিদআত আখ্যা দেয়া অথবা ভিত্তিহীন বলা উচিত নয়। এ রাত ফযীলতময়; এটাই সঠিক কথা। এ রাতে ইবাদতের জন্য জাগ্রত থাকলে এবং ইবাদত করলে অবশ্যই সওয়াব পাওয়া যাবে। এ রাতের অবশ্যই বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
বিশেষ কোনো ইবাদত নির্দিষ্ট নেই
এটা ঠিক যে, এ রাতে ইবাদতের বিশেষ কোনো তরিকা নেই। অনেকে মনে করে থাকে, এ রাতে বিশেষ পদ্ধতিতে নামায পড়তে হয়। যেমন প্রথম রাকাতে অমুক সূরা এতবার পড়তে হয়। দ্বিতীয় রাকাতে অমুক সুরা এতবার পড়তে হয়। মূলত এগুলোর কোনো প্রমাণ নেই। এগুলো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন কথা, বরং এ রাতে যত বেশি সম্ভব হয় নফল নামায পড়বে, কুরআন তেলাওয়াত করবে, যিকির করবে, তাসবীহ পড়বে, দুআ করবে, এ সকল ইবাদত এ রাতে করা যাবে। কারণ, এ রাতের জন্য নির্দিষ্ট কোনো ইবাদত নেই।
এ রাতে কবরস্থানে গমন
এ রাতের আরেকটি আমল আছে। একটি হাদীসের মাধ্যমে যার প্রমাণ মিলে। তা হলো এ রাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জান্নাতুল বাকীতে তাশরীফ নিয়েছিলেন। যেহেতু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জান্নাতুল বাকীতে এ রাতে গিয়েছেন, তাই মুসলমানরাও এ রাতে কবরস্থানে যাওয়া শুরু করেছে। কিন্তু আমার আব্বাজান মুফতী শফী (রহ.) বড় সুন্দর কথা বলেছেন, যা সব সময়ে স্মরণ রাখার মতো কথা। তিনি বলেছেন : যে বিষয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে যেভাবে প্রমাণিত, সেই বিষয়কে ঠিক সেভাবেই পালন করা উচিত। বাড়াবাড়ি করা উচিত নয়।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গোটা জীবনে এক শবে বরাতে জান্নাতুল বাকীতে গিয়েছেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। যেহেতু তিনি একবার গিয়েছেন, অতএব জীবনে যদি এক শবে বরাতে কবরস্থানে যাওয়া হয়, তাহলে ঠিক আছে। কিন্তু যদি প্রতি শবে বরাতে গুরুত্বের সাথে কবরস্তানে যাওয়া হয়, একে যদি জরুরি মনে করা হয়, একে যদি শবে বরাতের একটি অংশ ভাবা হয় এবং কবরস্থানে গমন করা ছাড়া শবে বরাতই হয় না মনে করা হয়, তাহলে এটা হবে বাড়াবাড়ি।
সুতরাং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাতের অনুসরণে জীবনের এক শবে বরাতে কবরস্থানে গমন করলে এটা হবে সওয়াবের কাজ। হ্যাঁ, অন্যান্য শবে বরাতেও যাওয়া যাবে। কিন্তু যাওয়াটা জরুরি ভাবা যাবে না, নিয়ম বানিয়ে নেয়া যাবে না। মূলত দ্বীনকে সহীহভাবে বুঝবার অর্থ এগুলোই। যে জিনিস যে স্তরের, সেই জিনিসকে সেভাবেই মূল্যায়ন করতে হবে। বাড়াবাড়ি করা যাবে না।
নফল নামায বাড়িতে পড়বে
শুনেছি, অনেকে এ রাতে এবং কদরের রাতে জামাতের সাথে নফল নামায পড়ে। শবিনার মতো এখন সালাতুত তাসবীহকেও জামাতের সাথে পড়া হয়। মূলত সালাতুত তাসবীহর জন্য জামাত নেই। এটি জামাতের সাথে পড়া না-জায়েয। এ প্রসঙ্গে একটি মূলনীতি শুনুন। মুলনীতিটি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রমাণিত। তা হলো ফরয নামায এবং যেসব নামায রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জামাতের সাথে আদায় করেছেন। যেমন তারাবীহ, বিতর এবং ইসতিসকা ইত্যাদির নামায- এ সকল নামায ছাড়া অবশিষ্ট সব ধরনের নামায বাড়িতে পড়া উত্তম। ফরয নামাযের বৈশিষ্ট্য হলো, জামাতের সাথে আদায় করা।
ফরয নামাযের ক্ষেত্রে জামাত শুধু উত্তমই নয়; বরং ওয়াজিবের কাছাকাছি সুন্নাতে মুয়াক্কাদা। আর সুন্নাত ও নফল নামাযের বেলায় মূলনীতি হলো, এগুলো আদায় করবে নিজের ঘরে। কিন্তু ফুকাহায়ে কেরাম যখন লক্ষ্য করলেন, মানুষ অনেক সময় ঘরে পৌছে সুন্নাতকে রেখে দেয়। তারা সুন্নাত পড়ে না, ফাঁকি দেয়। ফুকাহায়ে কেরাম তখন ফতওয়া দিলেন, ঘরে চলে গেলে সুন্নাত ছুটে যাবার আশঙ্কা থাকলে মসজিদেই পড়ে নিবে। সুন্নাত যেন ছুটে না যায় তাই এই ফাতওয়া। অন্যথায় মূলনীতি হলো, সুন্নাত ঘরে পড়বে। আর নফল নামাযের বেলায় সকল ফকীহ ঐক্যমত যে, নফল নামায ঘরে পড়া উত্তম। হানাফী মাযহাব মতে নফল নামাজ জামাতের সাথে পড়া মাকরূহে তাহরীমী তথা না-জায়েয। সুতরাং নফল নামায জামাতের সাথে পড়লে সওয়াব তো দূরের কথা; বরং গুনাহ হবে।
নফল নামায একাকী পড়াই কাম্য
পক্ষান্তরে নফল এমন একটি ইবাদত, যে ইবাদতের মাধ্যমে বান্দা পরওয়ারদেগারের সাথে সম্পর্ক সৃষ্টি করে। এ সম্পর্কের মাঝে থাকবে তুমি আর তোমার প্রভু। গোলাম আর রবের একান্ত বিষয় এটা। যেমন হযরত আবু বকর সিদ্দীক রা.-এর ঘটনা । হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন: আপনি এত নিম্নস্বরে তেলাওয়াত করেন কেন? তিনি উত্তরে বলে ছিলেন, যে পবিত্র সত্ত্বার সাথে আমি চুপিসারে আলাপ করছি, তাকে তো শুনিয়ে দিচ্ছি। সুতরাং অন্য মানুষকে শুনানোর কী প্রয়োজন?
অতএব নফল ইবাদত নির্জনেই পড়া ভালো। যেহেতু এটা গোলাম আর প্রভুর একান্ত বিষয়।


No comments
মন্তব্যের জন্য আল বেলায়েত মিডিয়া এর পক্ষ থেকে আপনাকে ধন্যবাদ।