ইতিকাফের ফজিলত

ইতিকাফের ফযীলত

ফজরের সালাত জামাতের সাথে আদায় করে সূর্যোদয় পর্যন্ত মসজিদে অবস্থান করা অত্যন্ত সাওয়াবের কাজরাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন-

من صلى الفجر فى جماعة ثم قعد يذكر الله  تعالى حتى تطلع الشمس ثم صلى ركعتين كانت كأجر حجة وعمرة تامة  تامة  تامة

যে ব্যক্তি ফজরের সালাত জামাতের সাথে আদায় করবে এবং সূর্যোদয় পর্যন্ত যিকিরে লিপ্ত থাকবে, অতঃপর সূর্য উঠে গেলে দুই রাকাত সালাত আদায় করে নেবে, তার আমলনামায় পূর্ণ একটি হজ ও পূর্ণ একটি উমরার সাওয়াব লিখে দেওয়া হবে। [সুনানে তিরমিযী : হাদীস নং ৫৮৩]


প্রিয় পাঠক! বছরের সাধারণ দিনগুলোতে নেক আমলের প্রতিদানের চিত্র যদি এমন হয়, তা হলে রামাদান মাসে এ আমলের প্রতিদান কেমন হবে তা বলাই বাহুল্য

রামাদানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আমল হল উমরা পালনরাসূলুল্লাহ , ইরশাদ করেছেন
عمرة في رمضان تعدل حجة أو حجة معى
রামাদানে এক উমরা এক ফরজ হজের সমতুল্য। [ভিন্ন বর্ণনায় এসেছে অথবা] আমার সাথে একটি হজ আদায়ের সমতুল্য। [প্রাগুক্ত : হাদীস নং ৯৩৯]

রামাদানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আমল হল সুন্নাত ইতিকাফ; আল্লাহ তায়ালাকে পাওয়ার জন্য নির্দিষ্ট দিনগুলোতে শরয়ী মসজিদে অবস্থান করাশরীয়ত সমর্থিত একান্ত প্রয়োজন ছাড়া ইতিকাফকারী মসজিদের বাইরে যেতে পারবে নাযে ব্যক্তি এই নিয়ম যথাযথভাবে নিশ্চিত করতে পারবে না বা যথাযথভাবে পালনে সক্ষম না, তার ইতিকাফ বিশুদ্ধ হবে না

রাসূলুল্লাহ ও নিয়মিত প্রত্যেক রামাদানের শেষ দশকে ইতিকাফ করতেনওফাতের [মৃত্যুর] বছর তিনি ২০ দিন ইতিকাফ করেছেনযেমনটি বুখারীর বর্ণনায় রয়েছে

সহীহ ও গ্রহণযোগ্য ইতিকাফে- ঘুমানোর জন্য মসজিদ থেকে য়নকক্ষে যাওয়া, অপ্রয়োজনে বাড়ি-ঘরে যাতায়াত ও পরিবারের সাথে সাক্ষাত করা, খাবারের জন্য কেন্টিনে যাওয়া, বন্ধুদের আড্ডায় গিয়ে হাসি-তামাশা করা, অপ্রয়ােজনীয় ক্রিয়াকর্ম করা ইত্যাদি যাবতীয় কাজ পরিহার করা অপরিহার্যঅন্যথায় ইতিকাফ বিশুদ্ধ হবে না
গ্রহণযোগ্য ও পরিপূর্ণ ফযীলতপূর্ণ ইতিকাফ আদায়ের জন্য আল্লাহ তায়ালার কাছে বিনীতভাবে কাকুতি-মিনতি করা, কায়মনো বাক্যে তাঁর কাছে দোয়া-মুনাজাত করা, সাহায্য প্রার্থনা করা, পুরা সময় ইবাদত বন্দেগী ও তাঁর যিকির-আযকারে লিপ্ত থাকার কোন বিকল্প নেই
খাঁটি ও বিশুদ্ধ ই'তিকাফ পালনের লক্ষে প্রত্যেক সওম পালনকারীর জন্য আবশ্যক হচ্ছে- নিজের জিহাকে সংযত রাখা এবং আল্লাহ আর-র যিকির-আযকারের মাধ্যমে জিহাকে সর্বদা সতেজ ও সিক্ত রাখা


রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন-

الا انبئكم بخير اعمالكم ، وأزكاها عند مليككم، وأرفعها في درجاتكُم ، وخير لكم من إنفاق الذهب والفضة ، وخير لكم من ان تلقوا عدوكم فتضربوا اعناقهم ويضربوا اعناقكم ؟» قالوا بلی ، قال : ذكر الله تعالى
আমি কি তোমাদেরকে এমন একটি পুণ্যময় কাজের কথা বলেদিব না, যা সমস্ত পুণ্যময় কাজের চেয়ে সর্বোৎকৃষ্ট; প্রতিপালকের নিকট অধিকতর পছন্দনীয়; তোমাদের শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা বহুগুণ বৃদ্ধিকারী; আল্লাহর পথে অঢেল স্বর্ণ-রৌপ্য খরচ করার চেয়ে অতি উত্তম এবং জিহাদের ময়দানে শত্রু বাহিনীর মুখোমুখি হওয়া, তাদেরকে হত্যা করা ও শত্রুসৈন্য কর্তৃক তোমরা নিহত [শহীদ হওয়ার চেয়েও শ্রেষ্ঠ? সাহাবায়ে কেরাম বললেন, অবশ্যই বলে দিবেন ইয়া রাসূলাল্লাহ! তিনি বললেন, তা হল আল্লাহর যিকির। [সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ৩৩৭৭]
ইবনে রজব হাম্বলী (রহ.) স্বীয় গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, আবু হুরায়রা (রা.) প্রতিদিন বারো হাজার বার সুবহানাল্লাহ’-এর যিকির করতেনতাঁকে প্রশ্ন করা হল, আপনি এত বেশি পরিমাণ যিকির করেন কেন?

তিনি জওয়াব দেন, আমি এই যিকিরের মাধ্যমে জাহান্নামের আগুনথেকে মুক্তি লাভের আশা রাখি
হাকেম রহ. বর্ণনা করেছেন, একজন বেদুইন রাসূলুল্লাহ (সা.) কে বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! ইসলামের তো বহু আমল রয়েছেতার মধ্য থেকে বিশেষ কিছু আমল আপনি আমাকে বাতলে দিনরাসূলুল্লাহ (সা.)বললেন-        لا يزال لسانك رطبا بذكر الله عز وجل
সর্বদা তুমি তোমার জিহ্বাকে আল্লাহর যিকির দ্বারা সিক্ত রাখবে| [সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ৩৩৭৫]
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন-
إن المسلمين و المسلمت   والمؤمنين والمؤمنت والقنتين والقنتت والصد قين والصدقت والصبرين والصبرت والخاشعين والخشعت والصقين والمتصدقين  والمتصدقت  والصائمين  والصئمت والحفظين فروجهم والحفظت الذكرين الله كيرا الذكرات  أعد الله لهم مغفرة أجرا عظيما

নিশ্চয় নিশ্চয় মুসলমান পুরুষ, মুসলমান নারী, ঈমানদার পুরুষ, ঈমানদার নারী, অনুগত পুরুষ, অনুগত নারী, সত্যবাদী পুরুষ, সত্যবাদী নারী, ধৈর্যশীল পুরুষ, ধৈর্যশীল নারী, বিনীত পুরুষ, বিনীত নারী, দানশীল পুরুষ, দানশীল নারী, রোযা পালনকারী পুরুষ, রোযা পালনকারী নারী, যৌনাঙ্গ হেফাযতকারী পুরুষ, যৌনাঙ্গ হেফাযতকারী নারী, আল্লাহর অধিক যিকিরকারী পুরুষ ও যিকিরকারী নারী তাদের জন্য আল্লাহ প্রস্তুত রেখেছেন ক্ষমা ও মহাপুরস্কার। [সূরা আহযাব : ৩৫]
যা হো, এ সময়গুলোতে সওম পালন করা, সালাত আদায় করা ও ইতিকাফ করা বান্দার জন্য অত্যন্ত আনন্দের বিষয়কারণ, সে মহান আল্লাহ তায়ালার অনগ্রহে মহা পুরস্কার ও প্রতিদান লাভে ধন্য হবে; মহা সাফল্যে সাফল্যমণ্ডিত হবে

সর্বোত্তম যিকির হলো কুরআনে কারীম তিলাওয়াত করাকুরআনে কারীমের প্রতিটি হরফের বিনিময়ে উত্তম প্রতিদান দেওয়া হয়আরপ্রত্যেক উত্তম প্রতিদানই দশগুণ বৃদ্ধি করে দেওয়া হয়তাছাড়াকুরআনে কারীম তার পাঠকারীর জন্য হাশরের ময়দানে সুপারিশ করবেঅতএব, রামাদানের শেষ দশকে মাত্র একবার কুরআন খতম করা অত্যন্ত উদাসীনতারই নামান্তর!
অনুরূপভাবে ইতিকাফরত অবস্থায় অধিকহারে সালাত আদায় করা উচিতফরযের পাশাপাশি নফল সালাত তথা ইশরাক, চাশত, আউওয়াবীন, তাহাজ্জদসহ অন্যান্য নফল সালাত অধিক হারে আদায়করা উচিত
সহীহ মুসলিমে বর্ণিত এক হাদীসে আছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) সাওবান (রা.)কে উদ্দেশ্য করে বলেছেন-
عليك بكثرة السجود لله فإنك لا تسجد لله  سجدة إلا رفعك الله بها درجة وحط عنك بها خطيئة
অধিক হারে সালাত আদায় করপ্রত্যেক সালাত- যা তুমি আল্লাহর সামনে আদায় করেছ, [তার বিনিময়ে] আল্লাহ তোমার এক স্তর মর্যাদা বৃদ্ধি করে দিবেন এবং একটি গুনাহ মাফ করে দিবেন। [হাদীস নং ১১২
রবিয়া ইবনে কাব (রা.) এর সূত্রে ইমাম মুসলিম রহ. বর্ণনা করেছেন, রবীয়া ইবনে কাব তিনি বলেন-

كنت أبيت مع رسول الله صلى الله عليه وسلم ، فاتيته بوضوئه وحاجته ، فقال لي : سلني فقلت : أسألك  مرافقتك في الجنة ،
 قال : أو غير ذلك قلت : هو ذاك، قال : فأعنى على نفسك بكسرة السجود.


কোন এক রাতে আমি রাসূলুল্লাহ (সা.) এর সাথে ছিলাম এবং ওযুর পানি, মিসওয়াক ও প্রয়োজনীয় বস্তু এনে দিলামরাসূলুল্লাহ ও আমাকে বললেন, তোমার যা ইচ্ছা আমাকে বলআমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি জান্নাতে আপনার সঙ্গ লাভ করতে চাইতিনি বললেন, এটা তো আছেই, আরও কিছু
চাআমি বললাম, এটাই যথেষ্টরাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, তা হলে তোমার এ প্রত্যাশা পূরণের জন্য তুমি বেশি বেশি সেজদা করে তোমাকে সাহায্য কর। [হাদীস নং ১১২২]
সালাত ও ই'তিকাফ মহাকল্যাণ বয়ে আনেইমাম মুসলিম বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ ও ইরশাদ করেছেন-
صلاة الرجل فى جماعة تضعف على صلاته في بيته وفي شوقه خمسا  وعشرين ضعفا ، وذلك أنه إذا توضا فأحسن الوضوء ، ثم خرج إلى المسجد ، لا يخرجه إلا الصلاة ، لم يخظ خطوة إلا رفعت له بها درجة ، وحط عنه بها خطيئة ، فإذا صلى لم تزل الملائكة  تصلى عليه ما دام في مصلا ، ما لم يحدث ، تقول : اللهم صل عليه ، اللهم ارحمه ، ولا يزال في صلاة ما انتظر الصلاة
ব্যক্তি ঘরে বা বাজারে সালাত আদায় করার পরিবর্তে জামাতে সালাত আদায় করলে পঁচিশ গুণ বেশি পুণ্যার্জন হয়তার কারণ, সে যখন উত্তমরূপে অযু করে, অতঃপর মসজিদের দিকে বের হয় এবং তাকে একমাত্র সালাতই বের করে নিয়ে যায়, তার প্রত্যেক কদমে একটি করে মর্যাদা বৃদ্ধি করা হয় এবং একটি করে গুনাহ মুছে দেওয়া হয়অতঃপর যখন সালাত শুরু করে মুসল্লায় থাকা অবস্থায় আরেকবার হদসগ্রস্ত [অযু নষ্ট] হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত ফেরেশতারা তার জন্য রহমতের দুআ করতে থাকেহে আল্লাহ! আপনি তার প্রতি রহমত বর্ষণ করুনহে আল্লাহ!আপনি তাকে রহম করুনআর যে যতক্ষণ সালাতের অপেক্ষা করে সে যেন সালাতেই থাকে। [সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম]
সুতরাং, ব্যক্তি যদি সালাতের জন্য মসজিদে গমন করে এবং সালাতের অপেক্ষায় বসে থাকে, তা হলে তার অবস্থা ও মর্যাদার উন্নতি হবেতা ছাড়া ইতিকাফ করা ও এক সালাতের পর আরেক সালাতের অপেক্ষায়বসে থাকার বিনিময় কী হতে পারে!
ইমাম যুহরী (রহ.) বলেন, আমি বিস্ময় বোধ করি- একজন মুসলিম কীভাবে ইতিকাফ পরিহার করে! অথচ রাসূলুল্লাহ (সা.) মদীনায় আগমনের পর আমৃত্যু ইতিকাফ করেছেন
ইতিকাফের উদ্দেশ্যে বিশ রামাদানের সূর্যাস্তের পূর্বেই মসজিদে প্রবেশ করতে হবে এবং ঈদের রাতে সূর্যাস্তের পর মসজিদ থেকে বের হবেযথাসাধ্য শেষ দশকে কদর লাভ করার চেষ্টা করে যেতে হবে, যে রাত হাজার রাতের চেয়ে শ্রেষ্ঠ
সহীহ বুখারী ও মুসলিমের বর্ণনায় এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন-
من قام ليلة القدر إيمانا واحتسابا غفر له ما تقدم من ذنيه
যে ব্যক্তি কদরের রাতে ঈমানের সাথে পুণ্যের আশায় কিয়াম করবে [সালাত আদায় করবে], তার পূর্ববর্তী যাবতীয় গুনাহ মাফ হয়ে যাবে। [হাদীস নং ১৯০১]


রাসূলুল্লাহ সা: কদরের রাত অনুসন্ধান করতেন এবং তাঁর সাহাবাদেরও তা অনুসন্ধান করার নির্দেশ দিতেনরামাদানের শেষ দশকের রাতগুলোতে তাঁর পরিবারের লোকদের জাগিয়ে দিতেন এই আশায় যেন তাঁরাও কদরের রাত পেয়ে যায় এবং ফযীলতপূর্ণ এ রাত থেকে কোনক্রমেই বঞ্চিত থেকে না যায়।।

একবার আয়েশা (রা.) রাসূলুল্লাহ (সা.)কে উদ্দেশ্য করে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি কদরের সন্ধান পেলে কোন দোয়া পড়ব?
নবীজী বললেন, তুমি এই দোয়া পড়বে- اللهم انك عفو كريم تحب العفو فاعف عنى
আল্লাহ আপনি ক্ষমাশীল-দয়ালুক্ষমাকে আপনি পছন্দ করেনতাই আমাকে ক্ষমা করে দিন
মুসনাদে আহমাদ : হাদীস নং ২৫৭৪১]


No comments

মন্তব্যের জন্য আল বেলায়েত মিডিয়া এর পক্ষ থেকে আপনাকে ধন্যবাদ।

Theme images by konradlew. Powered by Blogger.