কুরআন নাযিলে মাস মাহে রমজান:
কুরআন নাযিলে মাস মাহে রমজান:
রামাদান কুরআনের মাস। জিবরীল (আ.) এই মাসে প্রতিদিন রাসূলুল্লাহ (সা.)এর কাছে এসে কুরআনে কারীম শোনাশুনি করতেন। উসমান প্রতি রাতে এক খতম কুরআন তিলাওয়াত করতেন। রামাদান শুরু হলে ইমাম যুহরী হাদীস অধ্যয়ন গবেষণা ও ইলমচর্চা সবকিছু
বন্ধ করে দিতেন। শুধু কুরআনে কারীমের তিলাওয়াত করতেন। অনুরূপভাবে সুফিয়ান সাওরী সাধারণ ইবাদত কমিয়ে শুধু
কালামুল্লাহর তিলাওয়াতে নিবিষ্ট থাকতেন।
কাতাদাহ রামাদান ছাড়া প্রতি সপ্তাহে এক খতম কুরআন
তিলাওয়াত করতেন। রামাদান শুরু হলে প্রতি তিনদিন অন্তর এক খতম কুরআন তিলাওয়াত
করতেন। আর রামাদানের শেষ
দশকে প্রতি রাতে এক খতম করে কুরআন তিলাওয়াত করতেন।
বিশিষ্ট তাবেয়ী ইবরাহীম নাখায়ী (রা.) শেষ দশকে প্রতি রাতে এক খতম কুরআন তিলাওয়াত করতেন। আর অন্যান্য মাসে
তিন দিনে এক খতম কুরআন তিলাওয়াত করতেন।
সহীহ বুখারীতে বর্ণিত
عن عبد الله
بن مسعود، قال: قال رسول الله صلى الله عليه
وسلم اقر على قال: قلت أقرا عليك، وعليك
أنزل قال:
إني أشتهي أن أسمعه من غيري قال: فقرات
النساء، حتى إذا بلغت (فكيف إذا جئنا من كل أمة
بشهيد وجئنا بك على هؤلاء شهيدا) قال لي: گف أو امسك
فرأيت
عينيه تذرفان
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ একদিন রাসূলুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমাকে বললেন, [হে ইবনে মাসউদ!]। আমাকে তিলাওয়াত করে শোনাও। আমি বিস্ময় প্রকাশ করে। বললাম, [ইয়া রাসূলাল্লাহ কুরআন তো আপনার উপরই অবর্তীণ হয়। আমার মতো ব্যক্তি আপনাকে কীভাবে তিলাওয়াত করে শোনাবে? রাসূলুল্লাহ বললেন,
আমি অন্যের
তিলাওয়াত শুনতে ভালবাসি। [আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন] ফলে আমি
সূরা নিসা থেকে তিলাওয়াত শুরু করলাম। যখন আমি এই আয়াতে পৌঁছলাম-
فكيف إذا
جئنا من كل أمة بشهيد وجئنا بك على هؤلاء شهيدا
যখন আমি প্রত্যেক উম্মত থেকে একজন করে
সাক্ষ্য উপস্থিত করব এবং তাদের বিরুদ্ধে আপনাকে সাক্ষী
হিসাবে উপস্থিত করব, তখন কী উপায় হবে? [সূরা নিসা : ৪1]
তখন রাসূলুল্লাহ বললেন, এবার থামো! যথেষ্ট হয়েছে। এ সময় আমি রাসূলুল্লাহর দিকে
তাকিয়ে দেখি, তাঁর দু’চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরছে। [হাদীস নং : ৫০৫০]
মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে, রাসূল ইরশাদ করেছেন-
الصيام والقرآن
يشفعان للعبد يوم القيامة ، يقول الصيام : رب إني منعته الطعام والشراب
الشهوات بالنهار فشفعني فيه ، ويقول القرآن رب منتعة النوم بال ليل شفعني فيه
، يشفعان
বিচার দিবসে কুরআন ও সওম- এ দুটি বান্দার জন্য সুপারিশ করবে। সওম বলবে- 'হে আল্লাহ! আমি তাকে দিনের বেলা। খাদ্য পানীয় ও রতিবিলাস থেকে নিরত রেখেছি। সুতরাং, তার ব্যাপারে আমার
সুপারিশ মঞ্জুর করুন। কুরআন বলবে- “হে আল্লাহ ! আমি আপনার এই বান্দাকে রাতের বেলা ঘুম থেকে জাগ্রত রেখেছি। সুতরাং, আপনি তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ কবুল করুন। ফলে উভয়ের কৃত সুপারিশ গৃহীত হবে। [মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ৬৬২৬] ।
তিনি আরও ইরশাদ করেছেন-
يجيء
القران يوم القيامة فيقول يا رب حله فيلبس تاج الكرامة ثم يقول يا رب زده فيلبس حلة
الكرمة ، ثم يقول يا رب ارض عنه فيرضى عنه فيقول اقرا وازق ويزاد بكل آية حسنة
কিয়ামত দিবসে কুরআন এসে বলবে, হে আমার রব! এই
ছাহেবে-কুরআনকে সুন্দর করে সাজিয়ে দাও!' ফলে তার মাথায় সম্মানের মুকুট পরিয়ে
দেওয়া হবে। সে [কুরআন] আবার বলবে- ‘তাকে আরও বৃদ্ধি করে দাও। ফলে তাকে সম্মানের একটি লম্বা প্রতীকী পেশাক
পরিয়ে দেওয়া হবে। অতঃপর সে [কুরআন] আবার আবেদন করবে- ‘হে আল্লাহ! আপনি তার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে যান। ফলে আল্লাহ তাআলা
তার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে যাবেন। অতঃপর কুরআনের বাহককে বলা হবে- তুমি তিলাওয়াত করতে থাক আর জান্নাতের সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে থাক। প্রতিটি আয়াত তিলাওয়াতের বিনিময়ে তাকে দ্বিগুণ। পুণ্য বৃদ্ধি করে
দেওয়া হবে। [সুনানে তিরমিযী: হাদীস নং ২৯১৫ ]
আরও বর্ণিত হয়েছে, রাসূল এ ইরশাদ করেছেন-
إن القرآن
يلقى صاحبه يوم القيامة حين ينشق عنه
قبره گالرجل الشاحب يقول : هل تعرفني ؟ فيقول
له : ما أعرفك
، فيقول : أنا صاحبك القرآن الذي أظماتك في الهواجر، وأسهرت
ليلك ، وإن
كل تاجر من وراء تجارته وأنت اليوم من
وراء كل تجارة ، قال : فغظی الملك يمينه ، والخلد بشماله ،
ويوضع على رأسه تاج الوقار ، وبكسى والده حلتين لا يقوم
لهما أهل الدنيا ، فيقولان بما كسينا هذا فيقال :باخذ ولدكما القران ثم يقال اقرأ واصعد في درج الجة وغرفها فهو في صعود ما دام يقرأ هذا كان أو ترتيلا.
পুনরুত্থান দিবসে মানুষ যখন কবর ফেঁড়ে জেগে উঠবে,
তখন কুরআনে কারীম
একজন ছোট মানুষের আকৃতিতে তার বাহকের সঙ্গী হবে। কুরআন তাকে বলবে, তুমি কি আমাকে চেনো!
কুরআনের বাহক বলবে,
না; আমি তোমাকে চিনি না! কুরআন বলবে, আমি তোমার সেই সঙ্গী কুরআন, যে তোমাকে। দিনের বেলা তৃষার্ত ও
রাতের বেলা জাগ্রত রেখেছে। প্রত্যেক ব্যবসায়ী তার ব্যবসা-বাণিজ্যের
শেষে লাভ অর্জন করে, আজকে তোমার যাবতীয়
পূণ্যকর্মের উত্তম প্রতিদান দেওয়া হবে। নেক আমল দেওয়া
হবে ডান হাতে আর বদ আমল দেওয়া হবে বাম হাতে। আর তার মাথায়
মর্যাদার তাজ পরিয়ে দেওয়া হবে; তার পিতামাতাকেও পরিয়ে দেওয়া হবে সম্মানের
জোড়া পোশাক। কারণ, দুনিয়ার জীবনে তারা তাকে কুরআনের বাহক বানানোর জন্য সবকিছুই করেছে। এত বিপুল মর্যাদা দেখে
পিতামাতা সবিস্ময়ে বলবে, হে আমাদের প্রভু! আমাদের কোন আমলের কারণে আমাদের এ
সম্মান দেওয়া হল?
তাদের বলা হবে,
কারণ, তোমরা তোমাদের সন্তানদের কুরআন। পড়িয়েছ। অতঃপর কুরআনের
বাহককে নির্দেশ দেওয়া হবে তুমি কুরআন তিলাওয়াত করতে থাক আর
জান্নাতের সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে থাক। যেখানে গিয়ে তোমার তিলাওয়াত শেষ হবে, সেখানেই তোমার অবস্থান হবে। ফলে কুরআনের বাহক কুরআন তিলাওয়াত করতে থাকবে আর উপরে উঠতে থাকবে। যে যেই গতিতে তিলাওয়াত করবে, সে সেই গতিতে উপরে উঠবে। দ্রুত পড়লে দ্রুত, ধীরে পড়লে ধীরে।। [মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা : হাদীস নং ৩০০৪৫]।
এই কুরআন আমাদের পূর্বসূরিদের রাত্রিজগরণ ও
আল্লাহর দরবারে অশ্রু বিসর্জনের ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা
রেখেছে। উবাইদ ইবনে উমাইর এও বলেন, আমি একবার আয়েশা সিদ্দীকা (রা.)
-কে প্রশ্ন করলাম,
রাসূলুল্লাহ (সা.)
থেকে সবচেয়ে আশ্চর্যজনক যে বিষয়টি আপনি প্রত্যক্ষ করেছেন, সে সম্পর্কে
আমাদের কিছু বলুন। তিনি ক্ষণকাল নীরব
থাকার পর বললেন, কোন এক বিশেষ রাতে
রাসূলুল্লাহ এই আমাকে বললেন-
يا عائشة ذ رني أتعبد الليلة لربي
আয়েশা! আমাকে ছেড়ে দাও! আজ রাতে আমি আমার প্রভুর ইবাদত করব।
আমি বললাম, আল্লাহর কসম! আমি আপনার কাছে থাকতে ভালবাসি এবং তা-ও ভালবাসি, যা আপনাকে আনন্দিত
করে। অতঃপর তিনি বিছানা
ছেড়ে পবিত্র হয়ে সালাতে দাঁড়ালেন এবং এত বেশি কাঁদলেন যে,
চোখের অশ্রুতে
তাঁর শ্মশ্রু মোবারক সিক্ত হয়ে গেল। তিনি কাঁদতেই
থাকলেন। আরও কাঁদলেন। ফলে মাটি পর্যন্ত ভিজে গেল। অবশেষে সালাতের জন্য ডাকতে এসে বিলাল
রাসূল
(সা.) এর এত কান্না দেখে বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনিও এত কাঁদেন?! অথচ আল্লাহ তাআলা আপনার পূর্বাপর যাবতীয় গুনাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন।
নবীজী জওয়াব দিলেন- أفلا أكون عبدا شكورا
আমি কি আমার রবের শোকরগুজার বান্দা হব
না?!...
রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাদের মাঝে কুরআন তিলাওয়াতকারীরূপে আগমন করেছেন। সূর্য যেমন সকালের পৃথিবীকে আলোকিত করে তোলে, রাসূলুল্লাহও তেমনই গোমরাহীর অন্ধকার দূর করে আমাদের জীবনকে আলোকিত করে তুলেছেন। আমাদের অন্তঃকরণ বিনা সংশয়ে দ্ব্যর্থহীনভাবে এ কথা মেনে নিয়েছে যে, তিনি যা বলেন তা সত্য; চির সত্য।
তিনি তো বিছানা ছেড়ে ইবাদত-বন্দেগীতে রাত
কাটাতেন। অধিক পরিমাণে কুরআন তিলাওয়াত করতেন। কান্নাকাটি করতেন।
বর্তমান যুগের কথা কী আর বলব! এখন তো পবিত্র কুরআন অনেক মডার্ন মুসলিমের
বাড়িঘর, শপিংমল, অফিস-আদালত ও কলকারখানায় শোভা-সৌন্দর্যের উপকরণে পরিণত হয়েছে! এ
কুরআনকে
ব্যবসায়ীগণ দোকান-পাট ও মার্কেটের দেয়ালে টানিয়ে রাখে আর এর আয়াতকে সুদি কায়কারবার ও মিথ্যা শপথের ক্ষেত্রে ব্যবহার করে।
শুধু এটুকুই নয়; আপনি দেখবেন- গাড়ির সামনের গ্লাসে উপরের
দিকে কী সুন্দর করে কুরআনের আয়াত টানিয়ে রাখা হয়েছে আর ড্রাইভার
বিড়ি-সিগারেট ও মাদকদ্রব্যসহ বিভিন্ন নিষিদ্ধ বস্তু সামগ্রী পরিবহন
করে নিয়ে যাচ্ছে! যখন সালাতের সময় হয়, তারা সালাত আদায় করে না। এমনকি কখন সালাতের
ওয়াক্ত হয় আর কখন ওয়াক্ত শেষ হয়ে যায়, তার হিসাবটুকুও রাখে না!
আপনি কোন প্রাশাসনিক ভবনে গিয়ে দেখুন, বিভিন্ন
ওয়ালম্যাটের উপর কুরআনের আয়াতের ক্যালিগ্রাফি ও ডিজাইন কত সুন্দর ও
আকর্ষণীয়ভাবে তৈরি করে রাখা হয়েছে। অথচ ভবনের ভিতরে সুদ ঘুষের ছড়াছড়ি। দেদারছে চলছে
অন্যায়-অবৈধ ব্যবসা। আর তাদের এই বাহ্যত নির্মল পরিবেশ দেখে প্রতারিত হচ্ছে সাধারণ
মুসলমান।
আর
নারীরা একদিকে দ্বিধাহীনভাবে নিজেদেরকে প্রদর্শনী-পণ্য হিসেবে মানুষের সামনে প্রদর্শন করে যাচ্ছে, আর অন্যদিকে কুরআনের আয়াত খচিত আকর্ষণীয় লকেট বা লম্বা তাবিজে ছোট্ট কুরআন বা কুরআনের আয়াত কিংবা কুরআনের ছবি ঝুলিয়ে রাখছে; পাশাপাশি সুপ্ত
সৌন্দর্যের আলো(!) ছড়াতে গ্রীবাদেশ উন্মুক্ত করে রাখছে। যে কেউ বিনা
বাধায় তাদের এ রূপসুধা পান করতে পারে।পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেছেন-
وقرن في
بيوتكن ولا تبرجن تبرج الجاهلية الأولى و أقمن الصلوة و اتين الزكوة و ألطعن الله ورسوله انما يريد الله ليذهب عنكم الرجس اهل البت
ويطهركم تطهيرا--_
তোমরা গৃহাভ্যন্তরে অবস্থান
করবে; জাহেলী যুগের অনুরূপ
নিজেদেরকে প্রদর্শন করবে না। নামায
কায়েম করবে, যাকাত প্রদান করবে এবং আল্লাহ
ও তাঁর রসূলের আনুগত্য করবে। হে নবী
পরিবারের সদস্যবর্গ! আল্লাহ কেবল
চান তোমাদের থেকে অপবিত্রতা দূর করতে এবং তোমাদেরকে পূর্ণরূপে
পূত-পবিত্র রাখতে।

No comments
মন্তব্যের জন্য আল বেলায়েত মিডিয়া এর পক্ষ থেকে আপনাকে ধন্যবাদ।